Header Ads Widget

#ইমাম বুখারী রহ. এর জীবনী

ইমাম বুখারী রহ.এর জীবনী

নাম : মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল । কুনিয়াত : আবূ আব্দুল্লাহ । 

লকব : শায়খুল ইসলাম ও আমীরুল মু'মিনীন ফীল হাদীস । 

বংশ পরিচয় : 

মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুগীরা ইবনে বারদিযবাহ , আল জু'ফী আল বোখারী (রহ.) । ইমাম বোখারী (রহ.) - এর ঊর্ধ্বতন পুরুষ বারদিযবাহ । ছিলেন অগ্নিপূজক । ' বারদিযবাহ ' শব্দটি ফারসী । এর অর্থ কৃষক । তাঁর পুত্র মুগীরা বুখারার গভর্নর ইয়ামান আল - জু'ফী - এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন । এজন্য ইমাম বোখারীকে আল - জু'ফী আর বুখারার অধিবাসী হিসেবে বোখারী বলা হয় । ইমাম বোখারীর পিতামহ মুগীরা এবং পিতামহ ইবরাহীম সন্বন্ধে ইতিহাসে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না । অবশ্য জানা যায় যে, তার পিতা ইসমাঈল (রহ.) একজন মুহাদ্দিস ও বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন । ইমাম মালিক, হাম্মাদ ইবনে যায়দ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) প্রমুখ প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসের কাছে তিনি হাদীস শিক্ষা লাভ করেন । তিনি জীবনে কখনও হারাম বা সন্দেহজনক অর্থ উপার্জন করেননি । তাঁর জীবিকা নির্বাহের উপায় ছিল ব্যবসা - বাণিজ্য । তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল সচ্ছল । 

জন্ম ও মৃত্যু : 

ইমাম বোখারী ১৯৪ হিজরীর ১৩ ই শাওয়াল জুমু'আর দিন জুমু'আর সালাতের কিছু পরে বোখারায় জন্ম গ্রহণ করেন এবং ২৫৬ হিজরীর ১ লা শাওয়াল শনিবার ঈদের রাতে ইশার সালাতের সময় সমরকন্দের নিকটে খারতাংগ পল্লীতে ইন্তিকাল করেন । তাঁর বয়স হয়েছিল ১৩ দিন কম বাষট্টি বছর । খারতাংগ পল্লীতেই তাঁকে দাফন করা হয় । 

শৈশবকাল : 

ইমাম বোখারী (রহ.) - এর শিশু কালে পিতা ইসমা’ঈল (রহ.) ইন্তিকাল করেন । তাঁর মাতা ছিলেন পরহেযগার ও বুদ্ধিমতী । স্বামীর রেখে যাওয়া বিরাট ধন - সম্পত্তির দ্বারা তিনি তাঁর পুত্র আহমদ ও মুহাম্মাদকে লালন পালন করতে থাকেন । শৈশবে রোগে আক্রান্ত হলে মুহাম্মাদের চোখ নষ্ট হয়ে যায় , অনেক চিকিৎসা করেও যখন তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি কিছুতেই ফিরে এলো না , তখন তাঁর মা আল্লাহর দরবারে খুব কান্নাকাটি ও দু’আ করতে থাকেন । এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, এক বুযুর্গ ব্যক্তি তাঁকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন যে, তোমার ছেলের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন । স্বপ্নেই তিনি জানতে পারলেন যে, এই বুযুর্গ হযরত ইবরাহীম (আ.) । সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলেন যে , সত্যই তাঁর পুত্রের চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছে । বিস্ময় ও আনন্দে তিনি আল্লাহর দরবারে দু'রাকাআত শোকরানা সালাত আদায় করেন । 

শিক্ষাজীবন : 

পাঁচ বছর বয়সেই মুহাম্মাদ বুখারায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন । দশ বছর বয়সে তিনি হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য বুখারার শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম দাখিলী (রহ.) - এর হাদীস শিক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করেন । সে যুগের নিয়মানুসারে তাঁর সহপাঠীরা খাতা - কলম নিয়ে উস্তাদ থেকে শ্রুত হাদীস লিখে নিতেন ; কিন্তু ইমাম বোখারী ( রহ . ) সাধারণত খাতা - কলম কিছুই সঙ্গে নিতেন না । তিনি মনোযোগের সাথে উস্তাদের বর্ণিত হাদীস শুনতেন । ইমাম বোখারী (রহ.) বয়সে সকলের চেয়ে ছোট ছিলেন । সহপাঠীরা তাকে প্রতিদিন এই বলে ভর্ৎসনা করত যে, খাতা-কলম ছাড়া তুমি অনর্থক কেন এসে বস ? এক দিন বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন : তোমাদের লিখিত খাতা নিয়ে এস । এতদিন তোমরা যা লিখেছ তা আমি মুখস্থ শুনিয়ে দেই । 

কথামত তারা খাতা নিয়ে বসল আর এত দিন শ্রুত কয়েক হাজার হাদীস ইমাম বোখারী (রহ.) হুবহু ধারাবাহিক শুনিয়ে দিলেন । কোথাও কোন ভুল করলেন না । বরং তাদের লেখায় ভুল - ত্রুটি হয়েছিল , তারা তা শুনে সংশোধন করে নিল । বিস্ময়ে তারা হতবাক হয়ে গেল । এই ঘটনার পর ইমাম বোখারী (রহ .) - এর প্রখর স্মৃতিশক্তির কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল । ষোল বছর বয়সে ইমাম বোখারী (রহ.) বুখারা ও তার আশে পাশে শহরের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ থেকে বর্ণিত প্রায় সকল হাদীস মুখস্থ করে নেন । সেই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের খ্যাতিমান মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল - মুবারক ও ওযাফী ইবনুল জাররাহ (রহ.) এর সংকলিত হাদীস গ্রন্থসমূহ মুখস্থ করে ফেলেন । এরপর তিনি মা ও বড় ভাই আহমাদের সঙ্গে হজ্বে গমন করেন । হজ্ব শেষে বড় ভাই ও মা ফিরে আসেন । ইমাম বোখারী (রহ.) মক্কা মুকাররমা ও মদিনা তাইয়্যেবায় কয়েক বছর অবস্থান করে উভয় স্থানের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করতে থাকেন । এই সময়ে তিনি ' কাযায়াস-সাহাব ওয়াত-তাবিঈন ' শীর্ষক তাঁর প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন । এরপর মদীনায় অবস্থানকালে চাঁদের আলোতে ' তারীখে কবীর ' লিখেন । 

ইলমী সফর : 

ইমাম বোখারী (রহ.) হাদীস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিখ্যাত জ্ঞানকেন্দ্র কৃফা , বসরা , বাগদাদ , সিরিয়া , মিসর , খুরাসান প্রভৃতি শহরে বার বার সফর করেন । সেই সকল স্থানের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসদের থেকে তিনি হাদীস শিক্ষালাভ করেন । অন্যদের তিনি হাদীস শিক্ষাদান করতে থাকেন এবং সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থ রচনায় ও ব্যাপৃত থাকেন । তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ' জামি ' সহীহ বোখারী শরীফ সর্বপ্রথম মক্কা মুকাররামায় মসজিদে হারামে প্রণয়ন শুরু করেন এবং দীর্ঘ ষোল বছর সময়ে এই বিরাট বিশুদ্ধ গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত করেন । আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম বোখারী (রহ.) অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন । তিনি নিজেই বলেছেন যে , একলাখ সহীহ ও দুই লাখ গয়রে সহীহ হাদীস তাঁর মুখস্থ ছিল । তাঁর এই অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির খ্যাতি সারা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল । বিভিন্ন শহরের মুহাদ্দিসগণ বিভিন্নভাবে তাঁর এই স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা করে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছেন এবং সকলেই স্বীকার করেছেন যে , হাদীসশাস্ত্রে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই । এ সম্পর্কে তাঁর জীবনী গ্রন্থে বহু চমকপ্রদ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে । মাত্র এগার বছর বয়সে বুখারার বিখ্যাত মুহাদ্দিস দাখিলী'র হাদীস বর্ণনা কালে যে ভুল সংশোধন করে দেন, হাদীস বিশারদগণের কাছে তা সত্যিই বিস্ময়কর । ইমাম বোখারী (রহ.) এক হাজারেরও বেশি সংখ্যক মুহাদ্দিস থেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করেছেন । তাঁদের মধ্যে মাক্কী ইবনে ইবরাহীম, আবূ আসিম , ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, আলী ইবনুল মাদানী, ইসহাক ইবনে রাহওয়াই , হুমায়দী , ইয়াহইয়া , উবায়দুল্লাহ ইবনে মূসা, মুহাম্মদ ইবনে সালাম আল বায়কান্দী ও মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ আল ফারইয়াবী (রহ.) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । তাঁর উস্তাদদের অনেকেই তাবিঈদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন । আবার তিনি তাঁর বয়ঃকনিষ্ঠদের থেকেও হাদীস বর্ণনা ইমাম বোখারী (রহ.) থেকে বোখারী শরীফ শ্রবণকারীর সংখ্যা নব্বই হাজারেরও অধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে । এ ছাড়াও তাঁর ছাত্রসংখ্যা বিপুল । তাঁদের মধ্যে ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী, আবূ হাতিম আর রাযী (রহ.) প্রমুখ প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

আরো পড়ুন: #উপস্থিত বুদ্ধি

তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন শাগরিদ : 

ইমাম বোখারী (রহ.) অসংখ্য শাগরিদ রয়েছে যাদের গণনা প্রায় অসম্ভব । তাঁর অন্যতম প্রসিদ্ধ ছাত্র ফেরারি (রহ.) বলেন, ইমাম বোখারী (রহ.) থেকে শুধু বোখারী শরীফ শ্রবণ করেছেন ৯০ হাজার ছাত্র । এখন আমি ব্যতীত তাঁর থেকে বোখারী রেওয়ায়াতকারী আর কেউ বাকী নেই । এ ছাড়াও আরো অনেক ছাত্রই তাঁর থেকে রেওয়ায়াত করেছেন । এখানে প্রসিদ্ধ কয়েকজনের নাম দেওয়া হলো : 

১. আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (রহ.) (ইমাম মুসলিম রহ.) 

২. আবু ঈসা আত তিরমিযী (রহ.) ( ইমাম তিরমিযী রহ . ) 

৩. আবু আব্দুর রহমান আননাসায়ী (রহ.) ( ইমাম নাসায়ী রহ.) 

8. আবু হাতেম রাজী (রহ. ) 

৫. আবু যুরআ রাজী (রহ.) 

৬. ইমাম আবু ইসহাক ইব্রাহীম ইবনে ইসহাক আল হারাণী (রহ.) 

৭. হাফেজ সালেহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমা (রহ.) 

৮. আবু বকর ইবনে খুজায়মা (রহ.) 

৯. ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সায়েদ (রহ.) 

১০. মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ মুতীন (রহ.) 

১১. ইব্রাহীম ইবনে মা'বিল ইবনে হাজ্জাজ আন নাসাফী (রহ.) 

১২. হাম্মাদ ইবনে শাকের আন নাসাফী (রহ.) 

১৩. মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ আল ফেরাবরী (রহ.) 

১৪. আবু তালহা মানসুর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী (রহ.) 

১৫. মুহাম্মদ ইবনে জাফর (রহ.) 

১৬. ইব্রাহীম ইবনে মুসা আল জাওযী (রহ.) 

১৭. আহমদ ইবনে সাহল ইবনে মালেক (রহ.) 

১৮. হাতেম ইবনে খুজাইম আল আফরানি (রহ.) 

১৯. হাশেদ ইবনে ইসমাঈল আল বোখারী (রহ.) 

২০. ইসহাক ইবনে আহমদ ইবনে খালাফ আল বুখারী (রহ.) এ ছাড়া আরো অনেকে । 

গুণাবলী : 

ইমাম বোখারী (রহ.) মহৎ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন । দান খয়রাত করা তাঁর স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল । উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি পিতার বিরাট ধন-সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন কিন্তু তিনি তাঁর সবই গরীব দুঃখী ও হাদীস শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন । তিনি নিজে অতি সামান্য আহার করতেন । কখনও কখনও মাত্র দুই তিনটি বাদাম খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিয়েছেন । বহু বছর তরকারী ছাড়া রুটি খাওয়ার ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন । 

   ইমাম বোখারী (রহ.)- এর সততা জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছিল । প্রসঙ্গত এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায় । আবূ হাফস (রহ.) একবার তাঁর কাছে বহু মূল্যবান পণ্যদ্রব্য পাঠান । এক ব্যবসায়ী তা পাঁচ হাজার দিরহাম মুনাফা দিয়ে খরিদ করতে চাইলে তিনি বললেন : তুমি আজ চলে যাও, আমি চিন্তা করে । দেখি । পরের দিন সকালে আরেক দল ব্যবসায়ী এসে দশ হাজার দিরহাম মুনাফা দিতে চাইলে তিনি বললেন : গতরাতে আমি একদল ব্যবসায়ীকে দিবার নিয়্যাত করে ফেলেছি , কাজেই আমি আমার নিয়্যাতের খেলাফ করতে চাই না । পরে তিনি তা পূর্বোক্ত ব্যবসায়ীকে পাঁচ হাজার দিরহামের মুনাফায়ই দিয়ে দিলেন । নিয়্যাত বা মনের সংকল্প রক্ষা করার জন্য পাঁচ হাজার দিরহাম মুনাফা ছেড়ে দিতে তিনি দ্বিধাবোধ করেন নি । ইমাম বোখারী (রহ .) বলেন : আমি জীবনে কোন দিন কারো গীবত শিকায়াত করিনি । তিনি রামাযান মাসে পুরো তারাবীতে এক খতম, প্রতিদিন দিবাভাগে এক খতম এবং প্রতি তিন রাতে এক খতম কোরআন মাজীদ তিলাওয়াত করতেন । 

    একবার নফল সালাত আদায়কালে তাঁকে এক বিচ্ছু ষোল সতেরো বার দংশন করে, কিন্তু তিনি যে সুরা পাঠ করছিলেন তা সমাপ্ত না করে সালাত শেষ করেন নি । এভাবে তাকওয়া-পরহেযগারী, ইবাদত-বন্দেগী, দান-খয়রাতের বহু ঘটনা তাঁর জীবনীকারগণ বর্ণনা করেছেন, যা অসাধারণ ও বিস্ময়কর । 

   ইমাম বোখারী (রহ.) কে জীবনে বহু বিপদ ও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে । হিংসুকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেন । বোখারার গভর্নর তাঁর দুই পুত্রকে বিশেষভাবে প্রাসাদে গিয়ে হাদীস শিক্ষাদানের আদেশ করেন । এতে হাদীসের অবমাননা মনে করে ইমাম বোখারী (রহ.) তা প্রত্যাখ্যান করেন । এ সুযোগে দরবারের কিছুসংখ্যক হিংসুকের চক্রান্তে তাঁকে শেষ বয়সে জন্মভূমি বোখারা ত্যাগ করতে হয়েছিল । এ সময় তিনি সমরকন্দবাসীর আহবানে সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন । পথিমধ্যে খারতাংগ পল্লীতে তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলেন । সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পয়লা শাওয়াল শনিবার ২৫৬ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন । দাফনের পর তাঁর কবর থেকে সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে থাকে । লোকেরা দলে দলে তাঁর কবরের মাটি নিতে থাকে । কোনভাবে তা নিবৃত্ত করতে না পেরে পরে কাঁটা দিয়ে ঘিরে তাঁর কবর রক্ষা করা হয় । পরে জনৈক ওলী আল্লাহ মানুষের আকীদা নষ্ট হওয়ার আশংকায় সে সুঘ্রাণ বন্ধ হওয়ার জন্য দু'আ করেন এবং তারপর তা বন্ধ হয়ে যায় । 

বোখারী শরীফ : 

বোখারী শরীফের পূর্ণ নাম আল জামিউল মুসনাদুস্ সহীহুল মুখতাসারু মিন উমূরি রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াসুনানিহী ওয়া আয়্যামিহী । হাদীসের প্রধান প্রধান বিষয়সমূহ সম্বলিত বলে একে ' জামে ' বা পূর্ণাঙ্গ বলা হয় । কেবল মাত্র সহীহ হাদীস সন্নিবেশিত বলে ' সহীহ ' এবং ' মারফু ' ' মুত্তাসিল ' হাদীস বর্ণিত হওয়ায় মুসনাদ নামকরণ করা হয়েছে । 

   সকল মুহাদ্দিসের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে , সমস্ত হাদীসগ্রন্থের মধ্যে বোখারী শরীফের মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে এবং কোরআন মজীদের পরেই সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ গ্রন্থ । এক লাখ সহীহ ও দু'লাখ গায়ের সহীহ মোট তিন লাখ , হাদীস ইমাম বোখারী (রহ.) - এর মুখস্থ ছিল । এছাড়া তাঁর কাছে সংগৃহীত আরো তিন লাখ , মোট ছয় লাখ , হাদীস থেকে যাচাই - বাছাই করে তিনি দীর্ঘ ষোল বছরে এ গ্রন্থখানি সংকলন করেন । বোখারী শরীফে সর্বমোট সাত হাজার তিনশত সাতানব্বইটি হাদীস সংকলিত হয়েছে । ' তাকরার ' বা পুনরাবৃত্তি ( যা বিশেষ প্রয়োজনে করা হয়েছে ) বাদ দিলে এই সংখ্যা মাত্র দুই হাজার পাঁচশত তের - তে দাঁড়ায় । মু'আল্লাক ও মুতাবা'আত যোগ করলে এর সংখ্যা পৌঁছে নয় হাজার বিরাশিতে । বোখারী শরীফের সর্বপ্রধান বর্ণনাকারী ফারাবরী (রহ.)-এর বর্ণনা অনুসারে বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফিয ইবনে হাজার (রহ.) কর্তৃক গণনা সংখ্যা এখানে প্রদত্ত হয়েছে । বিভিন্ন বর্ণনাকারী ও গণনাকারীদের গণনায় এ সংখ্যার তারতম্য পরিলক্ষিত হয় । উপরে বর্ণিত সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাই ছাড়া ও প্রতিটি হাদীস সংকলনের আগে ইমাম বোখারী গোসল করে দু'রাকাআত সালাত আদায় করে ইসতিখারা করার পর এক-একটি হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন । এরূপ কঠোর সতকর্তা অবলম্বনের ফলে অন্যান্য হাদীসগ্রন্থের তুলনায় সারা মুসলিম জাহানে বোখারী শরীফ হাদীসগ্রন্থ হিসেবে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছে। বোখারী শরীফে বর্ণিত প্রতিটি হাদীস নিঃসন্দেহে সহীহ ও গ্রহণযোগ্য । আল্লাহর দরবারে বোখারী শরীফের মকবুলিয়াতের আলামত হিসেবে উল্লেখযোগ্য যে, আলিমগণ ও বুযুর্গানে দীন বিভিন্ন সময়ে কঠিন সমস্যায় ও বিপদাপদে বোখারী শরীফ খতম করে দু'আ করে ফল লাভ করে আসছেন বলে প্রসিদ্ধি আছে । 

বোখারী শরীফ সংকলনের কারণ : 

বোখারী শরীফ সংকলনের জন্য ইমাম বোখারী (রহ.)-এর উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর বিখ্যাত উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রহ.) পরোক্ষভাবে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন : তোমাদের মধ্যে কেউ কি এমন নেই, যে গায়রে সহীহ হাদীস থেকে ‘ সহীহ হাদীস ' বাছাই করে একখানি গ্রন্থ সংকলন করতে পারে ? 

  ইমাম বোখারী (রহ.) একবার স্বপ্নে দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মুবারকের উপর মাছি এসে বসছে, আর তিনি পাখা দিয়ে সেগুলোকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন । তা'বীর বর্ণনাকারী আলিমগণ এর ব্যাখ্যা দিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসসমূহ ‘ গায়রে সহীহ ' হাদীস থেকে বাছাইয়ের কার্য স্বপ্নদ্রষ্টা দ্বারা সম্পাদিত হবে । তখন থেকেই ইমাম বোখারীর মনে এরূপ একটি গ্রন্থ সংকলনের ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠে এবং তিনি দীর্ঘ ষোল বছরের অক্লান্ত সাধনার পর তা সমাপ্ত করতে সক্ষম হন । এই গ্রন্থ প্রণয়নের তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সহীহ হাদীসের একখানি উচ্চাঙ্গের গ্রন্থ রচনা করা এবং তাঁর সে উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে সফল হয়েছে । এগ্রন্থের হাদীস সন্নিবেশের পর তিনি চিন্তা করলেন যে, অধ্যয়নের সাথে সাথে যাতে লোকে এর ভাবার্থ ও নির্দেশিত বিধানাবলী সম্পর্কে অবহিত ও উপকৃত হতে পারে তজ্জন্য হাদীসসমূহ তিনি বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করে ' তরজমাতুল বাব ' বা শিরোনাম কায়েম করেন । 

    যেহেতু দীন ইসলামের শিক্ষা ব্যাপক ও বিস্তৃত , তাই এর বিধানাবলীর পরিসীমা নির্ধারণ করা দুষ্কর । পক্ষান্তরে ইমাম বোখারী (রহ.) কর্তৃক সংকলিত হাদীসগুলির সংখ্যা সীমিত । এই সীমিত সংখ্যক হাদীস দ্বারা দীন ইসলামের ব্যাপক ও বিস্তৃত শিক্ষার দলীল - প্রমাণ উপস্থাপন দুষ্কর । তাই ইমাম বোখারী ( রহ . ) সংকলিত হাদীসগুলি দ্বারা ব্যাপক বিধানাবলীর দলীল কায়েম করতে গভীর জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন । অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে ইশারা বা ইঙ্গিতের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে । ফলে বোখারী শরীফ অধ্যয়নে তরজমাতুল বাব ও বর্ণিত হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা আলিমদের দৃষ্টিতে একটি কঠিন সমস্যা ও প্রধান বিবেচ্য বিষয় । বোখারী শরীফ প্রণয়নের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই কঠিন সমস্যার সমাধান করতে মুহাদ্দিস , ফকীহ ও আলিম সমাজকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে । শিরোনামের এই রহস্য ভেদ করতে প্রত্যেকেই স্বীয় জ্ঞান - বিবেকের তৃণ থেকে তীর নিক্ষেপে কোন কসুর করেন নি । তবুও মুহাদ্দিস আলিমদের ধারণায় আজও কারো নিক্ষিপ্ত তীর লক্ষ্যস্থল ভেদে সবক্ষেত্রে পুরোপুরি সমর্থ হয়নি । এজন্য বলা হয়ে থাকে ফিকহুল বোখারী ফী তারজামাতিহী অর্থাৎ, ইমাম বোখারী (রহ.)-এর জ্ঞান - গরিমা ও বুদ্ধি - চাতুর্য তাঁর গ্রন্থের তরজমা বা শিরোনামের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে । পরবর্তীকালের মনীষীগণ এই লুক্কায়িত যথাযথ উদ্ধারে সর্বশক্তি ও শ্রম ব্যয় করে ও পূর্ণভাবে সফলকাম হতে ব্যর্থ হয়েছেন । বোখারী শরীফ সংকলনের পর থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর সকল দেশের সকল শ্রেণীর মুসলিম মনীষীগণ যেভাবে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করে আসছেন আল্লাহর কালাম কোরআন মজীদ ছাড়া আর কোন গ্রন্থের প্রতি এরূপ ঝুঁকে পড়েননি । একমাত্র ইমাম বোখারী ( রহ . ) থেকে নব্বই হাজারেরও অধিক সংখ্যক লোক এ গ্রন্থের হাদীস শ্রবণ করেছে । তারপর প্রত্যেক যুগে অসংখ্য হাদীস শিক্ষার্থী এ গ্রন্থ অধ্যয়ন করে আসছে । 

     এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শুরুহাত এ গ্রন্থের ভাষ্য পুস্তকের সংখ্যাও অগণিত । সে সবের মধ্যে হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) (জন্ম, ৭৭৩ হি.মৃ. ৮৫২ হি.) - এর ফতহুল বারী, শায়খ বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (রহ.)  (জ.৭৬২ হি. মৃ. ৮৫৫ হি.) - এর উমদাতুল - কারী ' ও আল্লামা শিহাবুদ্দীন আহমদ কাসতালানী ( রহ . ) ( জ . ৮৫১ হি.মৃ. ৯২৩ হি .) - এর ইরশাদুস - সারী  সমাধিক প্রসিদ্ধ । 

     এঁরা তিনজনই মিসরের অধিবাসী ছিলেন । এছাড়া বর্তমান যুগে সহীহ বোখারী অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ভাষ্য হিসেবে মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.) ( জ. ১২৪৪ হি. মৃ. ১৩২৩ হি.) কৃত লামেউদ দুরারী এবং মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (জ. ১২৯২ হি. মৃ. ১৩৫২ হি.) কৃত ফয়যুল বারী’ বিশেষভাবে সমাদৃত । ইমাম বোখারী (রহ.) ও তাঁর সংকলিত বোখারী শরীফের যে উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা ও এর উপরে যে ব্যাপক ইলমী চৰ্চা হয়েছে তার সহস্র ভাগের এক ভাগ বর্ণনা করাও এ স্বল্প পরিসরে সম্ভবপর নয় ।

আরো পড়ুন:হাদিসের গল্প

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ