তাঁদের মর্যাদা অসাধারণ পর্যায়ের ছিল । রাসূল (সাঃ)-এর সাহচার্য লাভে সাহাবীগণ যে নূর লাভ করেছিলেন সে নূর বা আলো সাহাবীদের আসাধারণ মর্যাদার উৎস । তাঁদের সমাজ ছিল একটি আদর্শ মানব সমাজ । জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের সততা, বিশ্বস্ততা, ভদ্রতা, আত্মত্যাগ, সদাচারণ, আল্লাহভীতি, তাকওয়া, ইহসান, সহানূভূতি, বীরত্ব, সাহসীকতা সবই ছিল নজীর বিহীন । তাঁরা ছিলেন নিষ্কলুষ ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী । এক কথায় বলা চলে রাসূল (সাঃ) যে সর্বোত্তম সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, সাহাবায়ে কিরাম হচ্ছেন সে সমাজের মর্যাদার অধিকারী । সাহবাগণ হলেন সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মানব এবং হযরত রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শের মূর্ত প্রতীক । রাসূল (সাঃ)-এর সান্নিধ্যে, তাঁর সংস্পর্ষে সাহাবীগণ পরিণত হন আদর্শমানবে । কথায় কাজে, বক্তৃতায়, ভাষণে, চলনে ফেরনে, উঠা-বসায়, আচার-আচরণে, ব্যবহারে এক কথায় যাবতীয় কর্মে রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শ তাঁদের মাঝে প্রতিফলিত হয় । তাঁরা ছিলেন রাসূল (সাঃ) -এর বাস্তব অনুকরণ ও অনুসরনীয় ব্যক্তি । এ কারণেই তাঁদের চরিত্রে এমন সামান্যতম কলংক ঢুকেনি যার কারণে তাঁদের সমালোচনা করা যেতে পারে ।
অতএব রাসূল (সাঃ)-এর কোন সাহাবীর সমলোচনা করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ । মহান আল্লাহ্ যাঁদের প্রতি সর্বোতভাবে নিজে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তাঁদের সমালোচনা করার অবকাশ থাকতে পারেনা । তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন সত্য এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং সকল প্রকার সমালোচনার উর্ধ্বে ।
সাহাবাদের মর্যাদার সমকক্ষ পরবর্তী যুগের কোন মুসলমানই তাঁদের সমমর্যাদা লাভ করতে পারেন নাই, কুরআন-সুন্নাহ এবং বিশ্ব মুসলিমের এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নাই । সাহাবীগণ ছাত্র হিসাবে রাসূলের কাছে আল্লাহ্র কালাম অধ্যয়ন করেন । আল্লাহ্ এবং রাসূল কর্তৃক পরবর্তী উম্মতের জন্য মনোনীত এবং ঘোঘিত হয়েছেন আদর্শ শিক্ষক এবং সত্যের মানদণ্ড রূপে । তাঁরাই প্রথম সূত্র রাসূল (সাঃ)-এর উম্মতের । পরবর্তী উম্মত আল্লাহর কুরআনের ব্যাখ্যা ভাষ্য, রাসূলের ঘৃণ্য পরিচয়, শিক্ষা, পবিত্র জীবনাদর্শ, তাঁদেরই মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি । উম্মতের মধ্যেকার এ সূত্র উপেক্ষা করলে, স্বকীয়তা বিনষ্ট হলে স্বয়ং রাসূল (সাঃ)-এর পূণ্য পরিচয়, এমন কি কুরআন পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় । তাই রাসূল (সাঃ) পূর্বাহ্নেই সাহাবাদের মান-মর্যাদার অসাধারণ গুরুত্ব ও প্রয়োজন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন । তাঁদের ঈমানের মত না হলে হিদায়াত নাই, মূল্য নাই; একমাত্র তাঁদের ঈমানের মত ঈমানই নির্ভরযোগ্য, হিদায়াতের মানদণ্ড; তাঁদের আদর্শের অনুসরণেই পরবর্তীরা আল্লাহ্র প্রসন্নতা লাভ করতে পারে । সাহাবাদের মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা-
(১) আল্লাহ্ তাঁদের অন্তরের তাওয়ার পরীক্ষা নিয়েছেন ।-(সূরা হুজুরাত)
(২) আল্লাহ্ তাওয়ার সত্যকে তাঁদের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে দিয়েছেন ।-(সূরা ফাতাহ)
(৩) সাহাবাদের সম্বোধন করে আল্লাহ্ বলেছেনঃ “আল্লাহ্ ঈমানকে তোমাদের প্রিয় এবং তোমাদের মনে ঈমানকে শোভা-সুন্দর করে দিয়েছেন; কুফুর, পাপ এবং আল্লাহর নাফরমানী তোমাদের কাছে অপ্রিয় করে রেখেছেন ।-(সূরা হুজুরাত)
(৪) “হে আল্লাহ্ আমাদেরকে সে সিরাতে মুস্তাকীমে পরিচালিত কর; তোমার অনুগ্রহ প্রার্থীরা যে পথে চলেছেন ।” সূরা ফাতিহাতে বিশ্ব মুসলিমকে যাঁদের পথে চলার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করার এ নির্দেশ দিয়েছেন, বলা বাহুল্য সাহাবাগণই সে শ্রেষ্ঠতম বা অনুগ্রহ ভাজনদের অন্যতম ।
(৫) “লোকেরা যেভাবে ঈমান এনেছে, তোমরা সে ভাবে তাঁদের মতই ঈমান আন; যখন তাঁদের বলা হয়, তখন তাঁরা বলে আমরা ঈমান এনেছি ”-সূরা বাকারার আয়াতটিতে মুনাফিক এবং অন্যান্য অমুসলিমদিগকে বলা হয়েছে যে, তোমরা সাহাবাদের ঈমানের মত খাঁটি ঈমান আনয়ন কর; আয়াতটি সাহাবাদের উদ্দেশ্যই ইংগিত করা হয়েছে ।
(৬) “মুনাফিকরা যদি তোমাদের ঈমানের মত ঈমান আন্নয়ন করে তাহলে তাঁরা হিদায়াত লাভ করবে । ”
লক্ষ্য করুন সাহাবাদের ঈমানকে কি ভাবে অন্যান্যদের ঈমানের, হিদায়াতের মানদণ্ড রূপে ঘোষণা করা হয়েছে । ”প্রথম পর্যায়ের মুহাজির, আনসার এবং তাঁদের আদর্শে উত্তম রূপে অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ্ প্রসন্ন রয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহ্র প্রতি প্রসন্ন । সাহাবাদের আদর্শ কিভাবে আল্লাহ্র প্রসন্নতার মানদণ্ড রূপে ঘোষণা করা হয়েছে । আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন, তাঁরাও আল্লাহ্র প্রতি প্রসন্ন রয়েছেন, তাঁদের জন্য জান্নাতের সু-সংবাদ দেয়া হয়েছে, চিরস্থায়ী জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দান করা হয়েছে । “তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠতম উম্মতরূপে তৈরী করা হয়েছে । অন্যান্যদের ক্ষেত্রে তোমরাই সাক্ষী নিযুক্ত হবে ।” বলাবাহুল্য সাহাবারাই আয়াতে বর্ণিত “শ্রেষ্ঠতম উম্মতের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন এতে কোন সন্দেহ নাই ।
(৭) জনসাধারণের জন্য শ্রেষ্ঠতম উম্মত হিসাবেই তোমাদের সৃষ্টি বা আত্ম প্রকাশ ”এখানেও বর্ণিত“ শ্রেষ্ঠতম উম্মত ”এর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন সাহাবাবৃন্দই ।
(৮) “তাঁরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত” সঠিক পথে; আয়াতটিকে সাহাবাদের সম্পর্কেই ঘোষণা করা হয়েছে । স্বয়ং আল্লাহ্ তাঁদেরকে হিদায়াতের সনদ দান করেছেন ।
(৯) “তাঁরাই সত্যনিষ্ঠ” (সূরা হাশর) প্রথম দিকে মুহাযির সাহাবাদের গুণাবলী বর্ণনার পর তাঁদেরকে “সাদিক” বা সত্যনিষ্ঠ বলে আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন ।
(১০) “তারাই সফল মনোরথ” (সূরা হাশর) বাক্যটির প্রথমাংশে আসার ও সাহাবাদের প্রশংসা করে আয়াতটিতে আল্লাহ্ সফল মনোরথ বলে তাঁদেরকেই চিহ্নিত করেছেন ।

0 মন্তব্যসমূহ